Pages

Friday, November 24, 2017

পদ্মাবতী

 ১৩০৩ সালে আলাউদ্দিনেই চিতোর দখলের সবথেকে আদি বিবরণটি পাওয়া যাচ্ছে আমির খসরুর 'খাজায়ে "উল -কুতুহ ' থেকে। সে যাত্রায় আমির ছিলেন খলজির সফরসঙ্গী। কিন্তু তিনি রানী অথবা পদ্মাবতীর বিন্দুমাত্র উল্লেখ ও করেননি। তাঁর পরের ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত ,১৩১৫ সালে লেখা 'দিওয়াল রানি খিজর খান '- এ আলাউদ্দিনের সঙ্গে গুজরাটের রাজকুমারীর প্রণয়কাহিনী নথিবদ্ধ হয়েছে কিন্তু পদ্মিনীর উল্লেখ নেই। চিতোর অধিকার নিয়ে সমকালীন অন্যান্য বিখ্যাত ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারনি বা ইসলামি -রাও রানি পদ্মিনী নামের কোন চরিত্রের নামোল্লেখ ও করেননি।

   সুন্দরী রানির  গল্প প্রথম শোনা গেল ১৫৪০ সালে ,মালিক মহম্মদ জয়সির 'পদ্মাবত ' - এ। এরপর থেকে শুরু করে ইতিহাসবিদ ফিরিস্তা বা হাজি -উদ-দবিরদের বৃত্তান্তে পদ্মিনীর প্রসঙ্গ এনেও কারও আখ্যানের সঙ্গে অন্য কারো মেলেনি। ১৮২০ সালে ব্রিটিশ লেখক জেমস টড রাজস্থানি লোকগাথার  যে সংকলন তৈরী করলেন তাতে প্রথম পদ্মিনীকে ঐতিহাসিক চরিত্র হিসাবে দেখানো হল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্বদেশি আন্দোলনের সময় পদ্মিনী আস্তে আস্তে ভারতীয় দেশভক্তির প্রতীক হয়ে উঠলেন। আরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রাজকাহিনি 'থেকে নেহেরুর 'দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া 'তেও আমরা এই মানসিকতার ছায়া দেখি। আবার প্রত্নতত্ব বিভাগের এই রায় শুনি ,চিত্রগড়ের  যে ছোট্ট হাভেলি রানির জওহর ব্রতের ঘটনাস্থল বা সরোবরঘেরা যে প্রাসাদ পদ্মিনী মহল বলে পরিচিত তার বয়সে কিছুতেই আলাউদ্দিনের সমকালীন নয়। আসলে পদ্মাবতী নিছক ইতিহাসের পাতায় বা সৌধের স্মরণে বাস করা যোদাবাই বা তাজমহলের মত ঘটনায় বাঁধা চরিত্র নয়।

Wednesday, November 22, 2017

ইসলাম সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থেও নিরামিষ আহারের সমর্থন দেখা যায়


ইসলাম সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থেও নিরামিষ আহারের সমর্থন দেখা যায়। আরবী সহি মসনদ গ্রন্থে আছে :- 

          "গাভীর দুগ্দ্ধ অশেষ উপকারী ,তাহার ঘৃত ঔষধ ,

                         কিন্তু মাংস অপকারী ও রোগ আনয়নকারী। "

                                                                                         ---গার্হস্থানীতি - সমিন উদ্দিন আহম্মদ। 

 মুসলমুসলমান সম্প্রদায়ের শেষ নবী পয়গম্বর হজরত মহম্মদ নিরামিষ আহার করিতেন ,এমন কি তিনি বলিয়াছেন যে ,যাহারা পিয়াজ রসুন খায় তাহারা মসজিদে যাইবার অনুপযুক্ত। এই সমন্ধে কোরানের একটি বাণী উদ্ধৃত করা হইল :-
             "লাই ইয়ানা লোল্লাহ লোহামোহা ওয়ালা দেমায়হা ওয়ালাকি ইয়ানা লেযৎ  তাক ওয়ামিন                                                    কুম। কাজালেকা দুঃখ খারাহা লেতোকার  বেরুল্লাহ অলোমা  হাদাকূম। "  

 "আল্লার নিকট তাহার মাংস ও তাহার রক্ত কখনও পৌঁছে না বা তিনি তাহা ইচ্ছা করেন না ,বরং তোমার অসৎকর্ম হইতে নিজেকে রক্ষা কর ,ইহাই তিনি ইচ্ছা করেন। তিনি আমাদের অধীনে কার্য্য নির্ব্বাহের জন্য পশুদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন ,সেজন্য তোমরা খোদার বহু প্রশংসা করিবে। এই সৎ পথ প্রাপ্তির অর্থাৎ সৎ শিক্ষার জন্যই খোদা এই ব্যবস্থা করিয়াছেন। যাহারা অন্যের মঙ্গল সাধন করে খোদা তাহাদের মঙ্গল সাধন করিয়া থাকেন। "
                                                                                                                          ---কোর -আন ২২হজর ৫। 

তান্ত্রিক উপাসনা কি ?

তান্ত্রিক উপাসনার মধ্যে পঞ্চমকার উপাসনার কথা আছে। এই পঞ্চমকার অর্থে : - ১) মৎস্য ,(২) মাংস ,(৩) মদ্য ,(৪) মুদ্রা ও (৫) মৈথুন বুঝায়।  এই পাঁচটি উপাদান নিয়ে মায়ের উপাসনা করিবার নির্দ্দেশ আছে। শাস্ত্রে এই পঞ্চমকারের যে প্রকৃত ব্যাখ্যা পরিলক্ষিত হয় তাহা হল , এই পঞ্চমকার বাহ্যিক কোন উপাদান বা জিনিস নয় ,অন্তরঅভ্যাসের ক্রিয়া। আর কি ভাবে তাহার কদর্থ করিয়া জীব নরকের পথে অগ্রসর হইতেছে এবং নিজের , দেশের ও দশের কত সবনাশ করিতেছে। 
১) মৎস্য  :-
অর্থাৎ গঙ্গা ও যমুনার মধ্যে দুইটি মৎস্য সাদা বিচরণ করিতেছে। উহাদের যিনি ভক্ষণ করেন  ,তিনি মৎস্য সাধক। ইড়া ও পিঙ্গলা নাম দুটি নাড়ী আমাদের নাসিকায় শ্বাস -প্রশ্বাসরূপে বহিতেছে। এই শ্বাস -প্রশ্বাস ভক্ষণ করেন -অথাৎ প্রাণায়াম দ্বারা সুষুম্নায় কুম্ভক করেন তিনিই মৎস্য -সাধক। 
২) মাংস :-
   
অর্থাৎ 'মা ' শব্দে রসনা ,আর তার অংশ বাক্য। যিনি এই বাক্য ভক্ষণ করেন -তিনিই মাংস -সাধক। খেচরী মুদ্রা দ্বারা তালু মূল ভেদ ক্রিয়া উপরে উঠিয়া বাক্য সংযম করেন -তিনি মাংস -সাধক। 
৩) মদ্য  :-
অর্থাৎ ব্রক্ষ্ম রন্ধ্র হিতে যে সোমধারার (অমৃত ) ক্ষরণ হয় ,তাহা পান করিয়া যিনি আনন্দময় থাকেন- তিনিই মদ্য -সাধক। 
৪) মূদ্রা  :-
 অর্থাৎ  সহস্রদলে মহাপদ্মে পারদের ন্যায় কোটী সূর্যাসম প্রকাশমান ও কোটি চন্দ্রের ন্যায় সুশীতল ,অতীব কমনীয় ,মহাকুণ্ডলিযুক্ত জ্ঞানোদয় হইলে তাহাকে মুদ্রা -সাধক বলে। 
৫) মৈথুন : -
অর্থাৎ মৈথুন পরমতত্ত্ব -সৃষ্টি ,স্থিতি ও প্রলয়ের কারন। মৈথুন হইতে সুদুর্লভ ব্রক্ষ্মজ্ঞান লাভ হয়। মূলাধারস্থিত কুণ্ডলিনী -শক্তিকে জাগ্রত করিয়া সহস্রদলে সদাশিবের সহিত সম্মিলন করার নাম মৈথুন। এখন বুঝিয়া দেখুন যে প্রকৃত  পঞ্চমকারের অর্থ কি ;


Tuesday, November 21, 2017

শিশুকথা

 শিশুর মানসিকতা :  

অনেক বাবা -মা মনে করেন ,আড়াই -তিন বছরের শিশু কী বোঝে। তাই তাঁরা ঐ শিশুর সামনেই অসংযত চলেন । অসতর্কভাবে কিছু খারাপ কথা বলে ফেলেন। শিশুটিরও যে একটি ব্যক্তিত্ব আছে ,চিন্তাশক্তি আছে ,তা অনেক ক্ষেত্রে খেয়ালই করা হয় না। কিন্তু শিশুর মন চমৎকার আয়নাস্বরূপ।  অপরকে অনুসরণ করতে সে ওস্তাদ যে কোন কথা বা ব্যবহার তার মনে সুন্দরভাবে দাগ কেটে বসে যায়। গুরুজনের কথা ও আচার তার ভিতর কার্বন কপি হয়ে যায়। এই ভাবেই শিশু ভাল খারাপ ব্যবহার শিখে ফেলে অল্প বয়সেই। বড় হলে সে তার পরিবেশে ঐ শেখা কথা আচারেরই প্রয়োগ করতে থাকে।  

        তেমনি আবার ,শিশুর সামনে যদি তার মা বাবা ঝগড়া -বিবাদ করে ,তার ফল হয় খুবই খারাপ। এটা ঠিকই যে ,ঝগড়া ও কথা -কাটা কাটির সময় স্বামী -স্ত্রী করোই মাত্রাজ্ঞান থাকে না। হয়তো একে অন্যকে দোষারোপ করে , চলতে থাকে অহং -এর গুঁতোগুঁতি। একে অপরকে সহ্য করে নিতে নারাজ হয়ে ওঠে। হয়তো উভয়েরই মুখ দিয়ে অনেক অবাঞ্ছিত কুৎসিত গালিগালাজ বেরিয়ে আসে। ছোটরা ওগুলি শুনে -শুনে রপ্ত করে নেয়। তা ছাড়া,সন্তানের চোখে বাবা -মা সাধারনতঃ অনেক বড় হয়ে থাকেন। যখন সে দেখে ,মা বাবাকে মোটেই গ্রাহ্য করে না এবং বাবাও কোন দরদ নেই মায়ের উপর ,তখন সেও আর তাদের শ্রদ্ধার আসনে বসাতে পারে না। তার অন্তর -জমিনের স্নেহ ,মায়া ,ভালবাসা ,শ্রদ্ধার অঙ্কুর গুলি থেঁতলে ,দুমড়ে -মুচড়ে যেতে থাকে। যাকে সে ভক্তির আসনে বসিয়ে পূজা করতে চায় ,তাকে নামিয়ে দিতে হচ্ছে একে বারে রাস্তার ধুলায়। এতে তার মনের মধ্যে সৃষ্টি হয় প্রচন্ড বিক্ষোভ। এক অব্যক্ত যন্ত্রনায় শিশুর ভেতরটা গুমরে মরতে থাকে। কাউকে সে একথা বলতে পারে না। যাকে ধরে জীবনের উত্থান হবে সেই বৃক্ষটির মূল যখন কাটা পড়ে যায় তখন ঐ সন্তান আর কাউকেই শ্রদ্ধা করতে পারে না ; শ্রদ্ধার চাষ যেই বন্ধ হয়ে গেল ,অমনি ওই কচি মনের ভবভূমিতে সুরু হয়ে গেল অশ্রদ্ধা ,অবজ্ঞা ও অমান্য করার চাষ। আলোর অভাব ঘটলেই প্রকৃতির নিয়মেই সেখানে চলে আসে অন্ধকারের আধিপত্য। ধূমায়িত হতে থাকে বঞ্চনার আপসোস। তারপর একদিন ঐ স্নেহবঞ্চিত জীবনটি খুব সহজেই হয়ে ওঠে রাস্তার গাঁটকাটা বা রকবাজ বা লম্পট। তার কারন বাড়ীর ভিতরে মা -বাবার যে মন -কষাকষি বা ঝগড়াঝাঁটি চলতে থাকে ,স্বাভাবিকভাবেই শিশু মনে তা ভাল লাগে না। ঐসব ঝামেলা থেকে সে রেহাই পেতে চায় এবং সেই জন্যই আশ্রয় খোঁজে বাইরে। এই আশ্রয় স্থলটি তার জীবনের পক্ষে কতটা সমীচীন বা অসমীচীন তা চিন্তা করার অবকাশ তার থাকে না। যাহোক একটা কিছু ধরে সে বাঁচতে চায়। মানুষ মূলতঃ আনন্দের সন্তান। আনন্দই ব্রক্ষ্ম। তাই প্রত্যেকেই বাঁচতে চায় আনন্দের মধ্যে এড়াতে চায় দুঃখকে। শিশুরা সতেজ কচি প্রাণ। স্ফূর্ত্তি বিকাশ তাদের মধ্যে স্বতঃ ও সহজ। আনন্দের যেখানে খাঁকতি সেখানে তাদের মন বসে না। তাই ঘরের মধ্যে যদি আনন্দ না পায় ,তারা সে আনন্দ অবশ্যই বাইরে খুঁজে নেবে। অনভিজ্ঞ ও অপরিণতবুদ্ধি হওয়ার জন্য আনন্দের প্রকৃতি সম্বন্ধে তাদের বোধ তো গজায় না। ফলে ,ভুল পথে পা পড়ে যেতে পারে। এই হল শিশুদের স্বাভাবিক মনের গতি। 

 

 ---------শ্রী দেবীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

Sunday, November 19, 2017

পরনিন্দা

পরনিন্দা  : 

   যে  তোমার কাছে অন্যের নিন্দা করছে নিন্দারই জন্য ,-নিরাকরনে নয়কো , সে তোমার নিন্দাও এমনি করেই অন্যের কাছেও কিন্তু , - ওর ই ভিতর -দিয়ে কিছু বাগিয়ে নিতে ; মানুষই সে ঐ রকমের , - নজর রেখো , সাবধান থেকো ,সায় দিও  না ,পার তো অন্যকেও সাবধান করা। 

মানুষ তোমার সম্বন্ধেই হোক ,বা অন্যের সম্বন্ধেই হোক,আড়ালে যা বলে বা করে -তোমার বা তার প্রতি তার মানসিক ভাব ও তেমনতর ,অন্ততঃপক্ষে তখন পৰ্যন্ত ,আর যারা অন্যের চর্চ্চা তোমার কাছে করে -তার অসাক্ষাতে -নিরোধ ও করে না ,নিয়ন্ত্রন করে না। অথচ নাম ও  বলতে চায় না বা বলেও কেউ ,-বুঝে নিও ,-তোমার প্রতি তার অনুরাগের চাইতে যার বিষয়ে বলছে তার প্রতি বীতরাগ -সম্পন্ন সমাধিক ,ব্যবহার করতে চায় তোমাকে তার বিরুদ্ধ হয়তো , --বাজিয়ে বুঝে চলো। 

দেখছ -যখনই কেউ কাউকে দোষারোপ করছে ,নিন্দা করে বেড়াচ্ছে ,-কোন হেতুর ধার না ধেয়ে ,তার বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীন বাস্তব অবস্হা সমন্ধে ওয়াকিব হওয়ার তোয়াক্কা না রেখে ,-জেক নিন্দা করে বেড়াচ্ছে -সহজভাবে তার অবস্হার কথা জিজ্ঞাসা করারও ফুরসুত হয়নি তার ,- অযৌক্তিক চরিত্রের খোলাসা পরে হাত নেড়ে বাক্যের সমারোহ -সজ্জা নিয়ে কায়দায় লোক ভেড়াতে চাচ্ছে ---হয় নিজের পক্ষে ,ঠিক বুজবে ,সেখানে এর অন্তরালে আছে -হয় কামিনী ,নয় কাঞ্চন ,নয় হীনমন্যতা ,কিংবা এ তিনেরই সংমিশ্ৰিন -যার ফলে ,সে স্বতঃই একটা অলীক ভাঁওতা সৃষ্টি করছে -জেক নিন্দা করছে সে তার অন্তরায় ভেবে ; ওই নিন্দাটা হচ্ছে ,নিজেকে লুকিয়ে চলার একটা সাবধানী চালবাজী অভিব্যক্তি ;একটু নাড়া দিলেই ঠিক পাবে। 

                                                                                       ---------শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

Saturday, November 18, 2017

গণেশ বর্ননা

গণেশ বর্ননা :

গণেশ অর্থাৎ গণ -ঈশ। 'গণ' সংখ্যাবাচি শব্দ। অনেকে বলে , গণ মানে জনগণ ,অর্থাৎ মানুষের সমষ্টি। কিন্তু শুধু মানুষ কেন ,গণ বলতে যা 'কিছু সব -পশুপাখি ,কীটপতঙ্গ ,বৃক্ষলতা ,সকল পদার্থ। এই সব কিছুরই যিনি ঈশ (অধিপতি ),তিনিই গণেশ। 

     ' ঈশ' শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত ঈশ -ধাতু থেকে ,মানে আধিপত্য। আধিপত্যের মধ্যে আছে অধিপতি। অধিপতির মধ্যে আবার দুটি শব্দ - অধি ও পতি। অধি -র উৎপত্তি ধা -ধাতু থেকে ,অর্থ ধারণ এবং পতি -র উৎপত্তি পা -ধাতু থেকে ,অর্থ পালন। তাহলে অধিপতি মানে যিনি ধারণ -পালন করেন।  

এইবার 'গণেশ 'শব্দের অর্থ দাঁড়ালো -সৃষ্টির যাবতীয় যা '-সব কিছুকে যিনি ধারণ ,পালন ও পোষন করেন। এই কারনে ,যে কোনো দেবপূজায় গণেশের পূজা হয় সর্বাগ্রে। 

গণেশের গজমুণ্ড কেন ? উত্তরে  শ্রীশ্রী ঠাকুর বলেছিলেন --

"একটা মানুষের বিশেষতঃ একটা শিশুর ঘাড়ে একটা হাতীর মাথা এনে বসানো সম্ভব কিনা তোমরাই ভেবে দেখ। "

 সাধারণ ভাবে দেখলেই তো বোঝা যায় ,এটা একেবারে অবাস্তব ব্যাপার। অথচ গনেশ বন্দনা ,প্রণাম ,ইত্যাদি জায়গায় 'গজানন ' গজেন্দ্ৰবদন ' প্রভৃতি শব্দের উল্লেখ আছে। তাহলে তার মানে কী ? উত্তরে বললেন -"শ্রেষ্ঠ -অর্থে গজ শব্দ। শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্ক যাঁর ,তিনিই গজানন আর যিনি সবাইকে ধরে রাখেন ,পালন করেন ,পরিচালনা করেন,তাঁর মস্তিষ্ক তো নিশ্চয় শ্রেষ্ঠ। "

       গণেশ চিত্রে বা প্রতিমায় দেখা যায় ,দুপাশে দুটি দাঁত -যেমন হাতীর থাকে। অথচ গণেশের প্রণাম -মন্ত্ৰে আছে "একদন্ত মহাকায়ং ".   দুই দন্তের উল্লেখ নেই কেন ? এর তাৎপর্য্য ই বা কী ? উত্তরে বললেন - দন্ত এসেছে দম -ধাতু থেকে অর্থ দমন ,নিয়ন্ত্রণ। তাহলে দন্ত মানে দমনকারী। "এক দন্ত" মানে একমাত্র দমনকারী বা নিয়ন্ত্রণকারী। "অসৎ বা অকল্যাণ যা 'তাকে তিনি দমিত ও সংযত করেন। এই হল তাঁর 'এক দন্ত 'নামের সার্থকতা। 

গণেশের চার হাতের বৈশিষ্ঠ হল -তাঁর চার দিকে লক্ষ্য। তাঁর চারপাশে তিনি সমান নজর রেখে চলেন। কোন দিক দিয়ে কোন অসুবিধা যাতে না আসে। 

        গণেশের বাহন মূষিক বা ইঁদুর। তার অর্থ ,ইঁদুরের মত খল ক্ষতিকারক স্বভাবের যারা ,গণপতি তাদেরকে অধীনে রাখেন। দুষ্ট প্রকৃতির মানুষ যারা তাদের আমরা এড়িয়ে চলি ,তারা অন্যায় করলে শাস্তিবিধান করি। তাদের কাছ থেকে কোন উপকার যে সম্ভব তা' আর বুঝতে পারি না। কিন্তু মূষিক বাহন করার ভিতর দিয়ে গণপতির চরিত্রের এই বিশেষ দিকটি প্রকটিত হয়ে উঠেছে যে , তিনি কাউকে বাদ দেন না। প্রকৃত লোকনেতা যিনি ,তিনি দুষ্টকেও বাদ দেন না। বরং তাকে তার ঐ ব্যাধি থেকে মুক্ত করে তুলতে ব্যবস্থা দান করেন। গণ নিয়েই তাঁর কারবার। গণের অধিপতি তিনি। তাই তিনি সবরকম লোককে বহন ,পোষন ও ধারণ করেন।

Friday, November 17, 2017

মা কালীকে জানুন

মা কালীর বর্ননা  : 

এই কালী কে ? কথিত আছে , তিনি দূর্গা দেবীর ললাট থেকে আবির্ভূতা দেবীবিশেষ। চন্ড নামক অসুরকে বধ করার সময় মায়ের মুখ ক্রোধে কৃষ্ণবর্ণ হয়ে উঠলে তাঁর ললাটদেশ থেকে করাল বদনা ,আসিপাশযুক্ত এই কালী আবির্ভূত হন।  কালীর মধ্যে কল (ধাতু) আছে। কল-ধাতুর মধ্যে আছে গতি ,গণনা ,শব্দ ,সংখ্যান। শ্রীশ্রী ঠাকুর বললেন কালী মানে সংখ্যায়নী গতিসম্পন্না যিনি। অথাৎ গুনিত হতে হতে বেড়ে`চলেন  যিনি। কী গুনিত হয়? মায়ের যা সত্তাসম্পদ অথাৎ মায়ের স্নেহমমতা ,কল্যাণময়ী প্রকৃতি ,সত্তাসংঘাতি শক্তির বিরুদ্ধে পরাক্রম ,তাই গুনিত হয়। মায়ের পূজা যারা করে ,মাকে যারা ভালোবাসে ,তাদের এইসব গুন্ বৃদ্ধি পায় ,অন্তরে তাদের মহাশক্তির জাগরণ ঘটে।
তাঁর দুই হাতে যেমন খড়গ ও নরমুণ্ড -ধ্বংসের প্রতীক ,অপর দুই হাতে আবার বর ও অভয় -তাঁর পদাশ্রিত সন্তান গনের জন্য। মায়ের আছে আট যোগীনি। তাদের মধ্যে ছয়টি নাম হল ভীষণা ,চন্ডী ,করলা ,শূলিনী ,হন্ত্রী ,ত্রিপুরা। এগুলি যদি আমরা প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করি তাহলে বলা যায় ,এ সব ই হল অকল্যাণ কে নিরোধ করার জন্য মায়ের শক্তি। এ ছাড়া আরো মায়ের দুটি যোগিনী আছে ,তাদের নাম কর্ত্রী এবং বিধাতৃকা ,মানে যে শক্তি সব কিছু গড়ে তোলেন ,সাজিয়ে দেন।
         

          শিবের বুকের উপর উপবিষ্টা মায়ের সম্পকে বিভিন্ন মত আছে। কিন্তু ঠাকুর বললেন -- শিবের বুকের উপর দন্ডায়মানা কালী -এটা সৃষ্টিতত্বের প্রাথমিক পর্য্যায়ের একটা ইঙ্গিত। সাংখ্য মতানুসারে,পুরুষ অক্রিয় (শব ).প্রকৃতির সংস্পর্শে তিনি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তখন সৃষ্টি শুরু হয়। পুরুষ স্থিরধর্মী ,ইংরেজিতে বলে 'পজিটিভ ' : আর নারী চরধর্মী -নেগেটিভ। এই পজিটিভ আর নেগেটিভ মিলনের ফেলে সৃষ্টির সূচনা হয়। বৈদ্যুতিক বাতির ক্ষেত্রেও পজেটিভ ও নেগেটিভ একত্রে হওয়ার  ফলে আলো জ্বলে।
তারই প্রতীক ঐ পজিটিভ ,নিষ্ক্রিয় শিবের বুকে নেগেটিভ চঞ্চলা কালির পদ চায়না। শিব মানেই সকলের ও সব-কিছুর শয়ন স্থান (শী -ধাতু ),অথাৎ যাঁর মধ্যে বিশ্বদুনিয়ার সব কিছু অবস্থিত ,অখন্ডবিশ্বসত্তা। তা এক এবং অদ্বিতীয় ,তা চিরকাল ছিল ,আছে এবং থাকবে।  কিন্তু তা কখনোই এই বিচিত্র শোভা নিয়ে দৃশ্যমান জগৎরূপে ফুটে উঠতে পারত না -যদি নাকি তার বক্ষে প্রকৃতির চরমানতা সংযুত্ত না হত।